রবিবার ১৭ মে ২০২৬ - ১০:৪৩
ইমাম জাওয়াদ (আ.): বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আদর্শ ও ঐশী সরকারের অগ্রদূত

ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.) কর্তৃক হযরত ইমাম মুহাম্মাদ তাকী (আ.)-কে নিয়ে প্রদত্ত বক্তব্যসমূহের নির্বাচিত অংশে এই মহান ইমামের ব্যক্তিত্ব ও জীবনাদর্শের বিভিন্ন দিক বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা তাঁর বক্তব্যসমূহে হযরত ইমাম মুহাম্মাদ তাকী (আ.)-এর ব্যক্তিত্ব ও সিরাহর বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ইমাম জাওয়াদ (আ.)-কে সামাজিক মুক্ত আলোচনা বা উন্মুক্ত সংলাপের প্রবর্তক, তাগুত ও অবাধ্য শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের অগ্রদূত এবং যুবসমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণাদায়ী ঐশী আদর্শ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।

এই বক্তব্যগুলোতে ইমামের সংক্ষিপ্ত কিন্তু সংগ্রামমুখর জীবনকে ইসলামী সমাজের জাগরণের জন্য এক মহান শিক্ষারূপে উপস্থাপন করা হয়েছে।

সামাজিক মুক্ত আলোচনার প্রবর্তক
মুক্ত আলোচনা একটি উত্তম কাজ। আমি মুক্ত আলোচনার পক্ষে; শুরু থেকেই এর সমর্থক ছিলাম। এটাই প্রথম কথা—আমরা মুক্ত আলোচনাকে প্রত্যাখ্যান করি না; বরং তা স্বাগত জানাই। সামাজিক মুক্ত আলোচনার প্রবর্তক ছিলেন ইমাম জাওয়াদ সালাওয়াতুল্লাহি আলাইহি। অবশ্য ইমাম জাওয়াদের পূর্বেও অন্যান্য ইমামদের যুগে বহু আলোচনা হতো; কিন্তু সবাই মিলে বসে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করার যে পদ্ধতি, তা প্রথম ইমাম জাওয়াদ (আ.)-ই চালু করেন।

[বক্তব্য: ১৩৬০/৩/২]

তিনি ছিলেন ইরানের জাতীয় আন্দোলনের ইমাম ও অগ্রনায়ক
১৭ই শহরিওরের রক্তাক্ত স্মৃতি সেই চিরঞ্জীব ও অবিস্মরণীয় শিক্ষারই ধারাবাহিকতা, যা ইমাম জাওয়াদ (আ.) আমাদের দিয়ে গেছেন। কেন একজন মহান ইমাম মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে শাহাদাতবরণ করেন? কেন সে যুগের জালিম শাসনব্যবস্থা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই পবিত্র বংশধরকে আর সহ্য করতে পারেনি?

এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সামনে উন্মোচিত হয় ইমাম জাওয়াদের জীবন ও ব্যক্তিত্বে। তিনি ছিলেন বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। তিনি ছিলেন আল্লাহর সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টাকারী। তিনি আল্লাহ ও কুরআনের জন্য সংগ্রাম করতেন। তিনি শক্তিধর ক্ষমতাসীনদের ভয় করতেন না। প্রকৃতপক্ষে, আজ যে আন্দোলনকে সমগ্র ইরানি জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তারই ইমাম, আদর্শ ও অগ্রনায়ক ছিলেন তিনি।

[তাবরিজ জুমার নামাজের মুসাল্লায় ১৭ই শাহরিওয়ার উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণ ১৩৬২/৬/১৭]

ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর জীবন যুবসমাজের জন্য আদর্শ
ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর জীবনও এক অনুকরণীয় আদর্শ। এমন মহান মর্যাদা ও মহিমার অধিকারী একজন ইমাম হয়েও তিনি মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। এটি কেবল আমাদের দাবি নয়; ইতিহাসই তা বলে—এমন ইতিহাস, যা অশিয়ারাও লিপিবদ্ধ করেছে।

এই মহান ব্যক্তিত্ব শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের সূচনালগ্নেই মামুনের দৃষ্টিতে এবং সকলের চোখে এক অসাধারণ মহিমা অর্জন করেছিলেন। এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো আমাদের জন্য আদর্শ হতে পারে।

[যুব সপ্তাহ উপলক্ষে একদল যুবকের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর সভা
১৩৭৭/২/৭]

দূরদর্শী ধর্মীয় কর্মসূচি প্রণয়ন
ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ঈদ ও শোকানুষ্ঠানের জন্য বুদ্ধিদীপ্ত ও সুপরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। কিছু অনুষ্ঠান যেভাবে পরিচালিত হয়, তা সম্পূর্ণ অদূরদর্শিতার পরিচায়ক।

হযরত জাওয়াদ (আ.) সম্পর্কে টেলিভিশন বা রেডিওতে কী আলোচনা করা হয়? ইমাম জাওয়াদ, ইমাম হাদী, ইমাম আসকারী, ইমাম রেজা এবং অন্যান্য আইম্মায়ে আহলুল বাইত (আ.) সম্পর্কে অত্যন্ত উৎকৃষ্ট রচনা ও গবেষণা বিদ্যমান। আমি নিজে, যিনি জীবনের দীর্ঘ সময় এসব বিষয়ে অতিবাহিত করেছি, যখন এসব লেখা পড়ি, তখন উপকৃত হই এবং আনন্দ পাই। তাহলে কেন এসব ব্যবহার করা হয় না?

এ বিষয়ে উৎকৃষ্ট রচনা, গভীর গবেষণা এবং হৃদয়গ্রাহী ও ঈমানজাগানিয়া বক্তব্যের কোনো অভাব নেই।

[সেদা ও সিমা সংস্থার প্রধান ও পরিচালকদের সঙ্গে সাক্ষাতে প্রদত্ত বক্তব্য ১৩৮৩/৯/১১]

ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর মহান শিক্ষা
ইমাম জাওয়াদ (আ.) অন্যান্য মাসূম ইমামদের ন্যায় আমাদের জন্য আদর্শ, নেতা ও অনুসরণীয় নমুনা। আল্লাহর এই যোগ্য বান্দার সংক্ষিপ্ত জীবন কুফর ও তাগুতের বিরুদ্ধে জিহাদে অতিবাহিত হয়েছে।

কৈশোরেই তিনি উম্মাহর নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন এবং অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে এক নিবিড় সংগ্রাম পরিচালনা করেন। এমনকি পঁচিশ বছর বয়সেই—অর্থাৎ এখনও যৌবনের প্রারম্ভে—তাঁর অস্তিত্ব আল্লাহর শত্রুদের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং তারা তাঁকে বিষপ্রয়োগে শহীদ করে।

যেভাবে আমাদের অন্যান্য ইমাম (আ.) নিজেদের জিহাদের মাধ্যমে ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসে নতুন নতুন অধ্যায় সংযোজন করেছেন, তেমনিভাবে এই মহান ইমামও ইসলামের সর্বাত্মক সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ দিককে বাস্তব রূপ দিয়েছেন এবং আমাদের এক মহান শিক্ষা দান করেছেন।

সেই মহান শিক্ষা হলো—যখন আমরা মুনাফিক ও ভণ্ড শক্তিগুলোর মুখোমুখি হই, তখন আমাদের কর্তব্য হলো জনগণকে সজাগ করে তোলা, যাতে তারা এসব শক্তির মোকাবিলা করতে পারে।

যদি শত্রু প্রকাশ্য শত্রুতা করে এবং ভণ্ডামি ও প্রতারণার আশ্রয় না নেয়, তাহলে তাকে চিহ্নিত করা সহজ হয়। কিন্তু যখন মামুন আব্বাসীর মতো কোনো শত্রু নিজেকে ইসলামপন্থী ও পবিত্রতার মুখোশে উপস্থাপন করে, তখন সাধারণ মানুষের জন্য তাকে চিনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

আমাদের যুগে এবং ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই ক্ষমতালোভী শক্তিগুলো সরাসরি জনগণের মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে ভণ্ডামি ও মুনাফিকির আশ্রয় নিয়েছে।

[জুমার নামাজের খুতবায় প্রদত্ত বক্তব্য
১৩৫৯/৭/১৮]

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha